কাবিননামার কোন ধারায় কী থাকে? জেনে নিন ২৫টি কলামের পূর্ণাঙ্গ আইনি ব্যাখ্যা
Published on August 29, 2026

একটি মুসলিম বিবাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও ধর্মীয় দলিল হলো ‘নিকাহনামা’ বা কাবিননামা। বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন অনুযায়ী বিবাহ রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। একটি প্রমিত কাবিননামায় সর্বমোট ২৫টি সুনির্দিষ্ট ধারা বা কলাম থাকে। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার পরিসংখ্যান ও পারিবারিক আদালতের তথ্য অনুযায়ী, দাম্পত্য বিরোধের প্রায় ৬০% জটিলতা তৈরি হয় কাবিননামার ধারাগুলো সঠিকভাবে পূরণ না করার কারণে। তাই বিয়ের আসরে কোনো ধারায় অন্ধভাবে স্বাক্ষর না করে প্রতিটি কলামের আইনি গুরুত্ব জানা নাগরিক অধিকার ও সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।
কাবিননামা কী এবং এর আইনি গুরুত্ব কতটুকু?
সরাসরি উত্তর (Direct Answer):
কাবিননামা হলো ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইনের আওতায় কাজী কর্তৃক নিবন্ধিত একটি আইনি চুক্তিপত্র। এতে বর ও কনের পরিচিতি, দেনমোহরের অঙ্ক ও পরিশোধের ধরন, পারস্পরিক শর্ত এবং কনের তালাক গ্রহণের অধিকারসহ মোট ২৫টি ধারা লিপিবদ্ধ থাকে। দাম্পত্য অধিকার রক্ষা এবং ভবিষ্যতে দেনমোহর ও খোরপোশ আদায়ে এটি প্রধান প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করে।
কাবিননামার মূল আইনি ভিত্তি:
- চুক্তিভিত্তিক দলিল: মুসলিম আইন অনুযায়ী বিবাহ একটি দেওয়ানি চুক্তি (Civil Contract)। কাবিননামা সেই চুক্তিরই লিখিত আইনি রূপ।
- অধিকারের নিশ্চয়তা: দেনমোহর, বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার (তালাকে তৌফিজ) এবং ভরণপোষণের শর্তাবলি আইনগতভাবে বলবৎ করার একমাত্র লিখিত মাধ্যম এটি।
- আইনি বাধ্যবাধকতা: বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজী) মাধ্যমে তা নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। নিবন্ধন না করলে কাজীর ২ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
কাবিননামার ২৫টি ধারায় মূলত কী কী তথ্য লিপিবদ্ধ থাকে?
সরাসরি উত্তর (Direct Answer):
কাবিননামার ১ থেকে ২৫ নম্বর ধারায় বর-কনের পূর্ণাঙ্গ পরিচয়, বিয়ের স্থান, দেনমোহরের শর্ত, সাক্ষীদের বিবরণ এবং রেজিস্ট্রেশনের প্রমাণ লিপিবদ্ধ থাকে। ১ থেকে ১১ ধারায় পরিচয় ও বিয়ের বিবরণ, ১২ থেকে ১৬ ধারায় দেনমোহর ও উপহার, ১৭ থেকে ২১ ধারায় বিশেষ অধিকার ও অনুমতি এবং ২২ থেকে ২৫ ধারায় স্বাক্ষর ও রেজিস্ট্রেশন ফি সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
নিচে কাবিননামার ২৫টি ধারার সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট তালিকা দেওয়া হলো:
| ধারার ক্রম | বিষয়বস্তু ও আইনি বিবরণ |
|---|---|
| ১ নম্বর ধারা | যে স্থানে বা যে গ্রামে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে তার বিস্তারিত ঠিকানা। |
| ২ নম্বর ধারা | বরের নাম, পিতার নাম ও বর্তমান এবং স্থায়ী ঠিকানা। |
| ৩ নম্বর ধারা | বরের বয়স (আইনানুযায়ী ন্যূনতম ২১ বছর হওয়া বাধ্যতামূলক)। |
| ৪ নম্বর ধারা | কনের নাম, পিতার নাম ও বর্তমান এবং স্থায়ী ঠিকানা (কনে কুমারী, বিধবা নাকি তালাকপ্রাপ্তা তা উল্লেখ থাকে)। |
| ৫ নম্বর ধারা | কনের বয়স (আইনানুযায়ী ন্যূনতম ১৮ বছর হওয়া বাধ্যতামূলক)। |
| ৬ নম্বর ধারা | কনে কর্তৃক নিযুক্ত উকিল বা প্রতিনিধির নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা। |
| ৭ নম্বর ধারা | কনের উকিল নিয়োগের সাক্ষীদের নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা (ন্যূনতম ২ জন)। |
| ৮ নম্বর ধারা | বর কর্তৃক নিযুক্ত উকিল বা প্রতিনিধির নাম ও ঠিকানা (যদি থাকে)। |
| ৯ নম্বর ধারা | বরের উকিল নিয়োগের সাক্ষীদের নাম ও ঠিকানা। |
| ১০ নম্বর ধারা | বিবাহের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা (কমপক্ষে ২ জন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষী)। |
| ১১ নম্বর ধারা | যে তারিখে বিবাহ সম্পন্ন বা নিবন্ধিত হলো সেই ইংরেজি ও হিজরি তারিখ। |
| ১২ নম্বর ধারা | মোট ধার্যকৃত দেনমোহরের পরিমাণ (অঙ্কে ও কথায়)। |
| ১৩ নম্বর ধারা | দেনমোহরের কত অংশ নগদ (মুয়াজ্জাল) এবং কত অংশ বাকি বা চাওয়ামাত্র পরিশোধযোগ্য (মুআজ্জাল)। |
| ১৪ নম্বর ধারা | দেনমোহরের কোনো অংশ হিসেবে জমি বা সম্পত্তি দেওয়া হয়েছে কিনা এবং তার বিবরণ। |
| ১৫ নম্বর ধারা | দেনমোহর পরিশোধের বিশেষ কোনো নিয়ম বা কিস্তির শর্ত থাকলে তার বিবরণ। |
| ১৬ নম্বর ধারা | বিবাহের সময় বর কর্তৃক কনেকে প্রদত্ত উপহার বা পণ্যের তালিকা (যদি থাকে)। |
| ১৭ নম্বর ধারা | ভরণপোষণ (খোরপোশ) বা পারস্পরিক সমঝোতার বিশেষ কোনো শর্তাবলি। |
| ১৮ নম্বর ধারা | তালাকে তৌফিজ: বর কনেকে তালাক দেওয়ার কোনো ক্ষমতা অর্পণ করেছে কিনা এবং কী কী শর্তে। |
| ১৯ নম্বর ধারা | স্বামীর তালাক প্রদানের অধিকার খর্ব বা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো শর্ত আছে কিনা। |
| ২০ নম্বর ধারা | দেনমোহর বা খোরপোশ পরিশোধ সংক্রান্ত দলিল সম্পাদনের বিবরণ। |
| ২১ নম্বর ধারা | বরের পূর্বে কোনো স্ত্রী বর্তমান আছে কিনা এবং থাকলে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী সালিসি কাউন্সিলের অনুমতিপত্র আছে কিনা। |
| ২২ নম্বর ধারা | বর কর্তৃক অন্য কোনো বিয়ে করার ক্ষেত্রে বর্তমান স্ত্রীর অনুমতি বা সালিসি কাউন্সিলের সার্টিফিকেটের বিবরণ। |
| ২৩ নম্বর ধারা | বর, কনে, উকিল ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর এবং টিপসহি। |
| ২৪ নম্বর ধারা | বিবাহ পরিচালনাকারী বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজী) স্বাক্ষর ও সিলমোহর। |
| ২৫ নম্বর ধারা | কাজী অফিসের রেজিস্টার বইয়ের ভলিউম নম্বর, পেজ নম্বর এবং রেজিস্ট্রেশনের চূড়ান্ত তারিখ। |
কাবিননামার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা কোনগুলো?
সরাসরি উত্তর (Direct Answer):
কাবিননামার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো হলো ১২, ১৩, ১৮ এবং ২১ নম্বর ধারা। এই ধারাগুলোতে দেনমোহরের মোট অঙ্ক, দেনমোহরের নগদ ও বাকির বিভাজন, স্ত্রীর তালাক গ্রহণের শর্তহীন অধিকার (তালাকে তৌফিজ) এবং বহুবিবাহের ক্ষেত্রে আইনি অনুমতির বিষয় উল্লেখ থাকে। এই ধারাগুলো সঠিকভাবে পূরণ না করলে ভবিষ্যতে মারাত্মক আইনি জটিলতা তৈরি হয়।
[ কাবিননামার ৪টি মূল স্তম্ভ ]
├── ধারা ১২ ও ১৩: দেনমোহর ও নগদ/বাকি নির্ধারণ
├── ধারা ১৮: তালাকে তৌফিজ (স্ত্রীর তালাক প্রদানের ক্ষমতা)
├── ধারা ১৯: স্বামীর স্বেচ্ছাচারী তালাক নিয়ন্ত্রণে শর্ত
└── ধারা ২১ ও ২২: বহুবিবাহের আইনি ছাড়পত্র
১. ধারা ১২ ও ১৩ (দেনমোহর নির্ধারণ ও বিভাজন)
- দেনমোহর মাফ নয়: দেনমোহর স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকার। মুখে মাফ বললেই এটি মাফ হয় না।
- নগদ বনাম বাকি: ধারা ১৩-তে দেনমোহরের কত টাকা বিয়েতে স্বর্ণালংকার বা নগদ দেওয়া হলো (নগদ বা মুয়াজ্জাল) এবং কত টাকা পরে দেওয়া হবে (বাকি বা মুআজ্জাল) তা স্পষ্টভাবে লিখতে হবে। বাকি দেনমোহর স্ত্রী যেকোনো সময় চাওয়ামাত্র স্বামী পরিশোধ করতে বাধ্য।
২. ধারা ১৮ (তালাকে তৌফিজ - স্ত্রীর তালাক দেওয়ার ক্ষমতা)
- এটি কাবিননামার সবচেয়ে যুগান্তকারী ধারা। ইসলামি আইন ও বাংলাদেশি আইনে স্বামী এই ধারার মাধ্যমে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ (Delegation of Power) করতে পারেন।
- অনেক সময় কাজীরা এই ঘরে ‘প্রযোজ্য নহে’ বা ‘না’ লিখে রাখেন, যা অত্যন্ত ভুল। এখানে শর্তহীনভাবে "স্ত্রীকে শর্তহীনভাবে তালাকে তৌফিজের অধিকার দেওয়া হলো" লেখা থাকলে স্ত্রী প্রয়োজনবোধে কোর্টে না গিয়েও সরাসরি স্বামীকে ডিভোর্স দিতে পারেন।
৩. ধারা ২১ ও ২২ (দ্বিতীয় বা বহুবিবাহের বৈধতা)
- ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি এবং স্থানীয় সালিসি কাউন্সিলের লিখিত ছাড়পত্র ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
- বর আগে বিবাহিত হলে এই কলামে সালিসি কাউন্সিলের অনুমোদনের নম্বর ও তারিখ উল্লেখ থাকা বাধ্যতামূলক।
কাবিননামা পূরণের সময় কোন ভুলগুলো কখনোই করা যাবে না?
সরাসরি উত্তর (Direct Answer):
কাবিননামা পূরণের সময় কোনো ঘরে ‘প্রযোজ্য নহে’ লিখে খালি রাখা, দেনমোহরের নগদ ও বাকির হিসাব অস্পষ্ট রাখা, এবং কনের বয়স যাচাই না করে অনুমাননির্ভর তথ্য দেওয়া যাবে না। প্রতিটি ঘর বর ও কনের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সাথে হুবহু মিলিয়ে সম্পূর্ণ বাংলায় বা ইংরেজিতে স্পষ্টাক্ষরে পূরণ করে স্বাক্ষর করতে হবে।
- কাটাকাটি বা ঘষামাজা এড়িয়ে চলা: কাবিননামার মূল ভলিউমে কোনো কাটাকাটি থাকলে পাশে কাজীর প্রত্যয়ন স্বাক্ষর নিতে হবে।
- এনআইডি (NID) অনুযায়ী বয়স ও নাম: কনের বয়স ন্যূনতম ১৮ এবং বরের বয়স ন্যূনতম ২১ বছর হতে হবে। ভুয়া জন্মসনদ ব্যবহার আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
- ১৮ নম্বর ধারায় দাগ না কাটা: কোনো অবস্থাতেই ১৮ নম্বর ঘরটিতে ক্রস বা দাগ কাটা যাবে না; পরিষ্কারভাবে স্ত্রীর তালাক গ্রহণের অধিকার লিপিবদ্ধ করতে হবে।
- সাক্ষীদের উপস্থিতি ও শনাক্তকরণ: কাবিননামায় উল্লেখিত সাক্ষীদের অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক ও মানসিকভাবে সুস্থ হতে হবে এবং সশরীরে উপস্থিত থেকে স্বাক্ষর করতে হবে।
কাবিননামা সংক্রান্ত সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. ১৮ নম্বর ধারা পূরণ না থাকলে বা ‘না’ লেখা থাকলে স্ত্রী কি তালাক দিতে পারবেন?
উত্তর: ১৮ নম্বর ধারায় ক্ষমতা দেওয়া না থাকলে স্ত্রী নিজে সরাসরি তালাক (তালাকে তৌফিজ) দিতে পারবেন না। তবে তিনি ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী পারিবারিক আদালতে মামলা করে ‘খোলা তালাক’ বা আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ নিতে পারবেন।
২. মূল কাবিননামা হারিয়ে গেলে কি নতুন করে তোলা সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ। যে কাজী অফিসে বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়েছিল, সেই অফিসে বা জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে (রেকর্ড রুম) নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে কাবিননামার সার্টিফাইড নকল বা নকল কপি (Nokol) তোলা যায়।
৩. বিয়ের কতদিন পর কাবিননামার সরকারি নকল কপি তোলা যায়?
উত্তর: কাজী সাধারণত বিয়ের পরপরই একটি অস্থায়ী রসিদ বা কপি দেন। মূল বালাম বইতে এন্ট্রি হওয়ার পর সাধারণত ৭ থেকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে কাজীর কাছ থেকে বা জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে মূল সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করা যায়।
৪. দেনমোহরের পরিমাণ কি পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায়?
উত্তর: কাবিননামায় একবার দেনমোহর নির্ধারিত হয়ে স্বাক্ষর হয়ে গেলে স্বামী একতরফাভাবে তা কমাতে পারেন না। তবে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের পারস্পরিক সম্মতিতে দেনমোহরের পরিমাণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।
উপসংহার
কাবিননামা কেবল একটি সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বর ও কনে উভয়ের ভবিষ্যৎ জীবনের আইনি সুরক্ষাকবচ। বিশেষ করে ১২, ১৩ ও ১৮ নম্বর ধারার সঠিক ব্যবহার নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি সুস্থ পারিবারিক বন্ধন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পাদনের সময় কাজীর ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করে বর-কনে ও তাদের অভিভাবকদের প্রতিটি ধারা পড়ে ও বুঝে স্বাক্ষর করা উচিত।

