Kobul Logo

কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম (তালাকে তাওফিজ) কেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ? আইনি ও শরয়ী ব্যাখ্যা

Published on August 25, 2026

কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম (তালাকে তাওফিজ) কেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ? আইনি ও শরয়ী ব্যাখ্যা

মুসলিম বিবাহ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে 'নিকাহনামা' বা কাবিননামা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাগজ নয়; এটি বর ও কনের দাম্পত্য জীবনের মৌলিক অধিকার ও সুরক্ষার একটি চূড়ান্ত সামাজিক ও আইনি চুক্তিপত্র। বাংলাদেশে 'মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪' এবং 'মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১'-এর অধীনে বিয়ের নিবন্ধনের জন্য ২৪টি কলামবিশিষ্ট সরকারি ‘ফরম ঘ’ (নিকাহনামা) ব্যবহৃত হয়। এই ২৪টি কলামের মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং প্রয়োজনীয় কলামটি হলো ১৮ নম্বর কলাম, যা আইনি ভাষায় ‘তালাকে তাওফিজ’ (Talaq-e-Tawfeez) বা অর্পিত তালাকের অধিকার নামে পরিচিত।

বাঙালি সমাজে সচেতনতার অভাবে বা কাজীদের গাফিলতির কারণে প্রায়ই এই কলামটি ফাঁকা রাখা হয় বা না বুঝেই 'না' লিখে দেওয়া হয়। অথচ আইন ও শরিয়তের দৃষ্টিতে ১৮ নম্বর কলামটি নারীর বৈবাহিক সুরক্ষা, আত্মমর্যাদা এবং আইনি জটিলতা ছাড়াই মুক্ত হওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী পথ খুলে দেয়।


কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম কী এবং এতে কী লেখা থাকে?

ডিরেক্ট আনসার (সরাসরি উত্তর): কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামটি হলো ‘তালাকে তাওফিজ’ বা স্ত্রীকে তালাকের অধিকার অর্পণের স্থান। এতে প্রশ্ন লেখা থাকে: "স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করিয়াছে কি না? করিয়া থাকিলে কি শর্তে?" এই ঘরের মাধ্যমে স্বামী স্বেচ্ছায় স্ত্রীকে নির্দিষ্ট শর্তে বা শর্তহীনভাবে নিজের পক্ষ থেকে তালাক গ্রহণের আইনি ও ধর্মীয় ক্ষমতা প্রদান করেন।

ইসলামী ফিকহ এবং বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী তালাকের প্রাথমিক ক্ষমতা স্বামীর হাতে ন্যস্ত। তবে 'মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১'-এর ৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, স্বামী চাইলে নিজের এই তালাক প্রদানের অধিকারটি স্ত্রীর কাছে অর্পণ বা ডেলিগেট (Delegate) করতে পারেন। এটিকে ইসলামী শরিয়তে বলা হয় ‘তাফউইজে তালাক’ বা ‘তালাকে তাওফিজ’

বিষয় বিবরণ
আইনি ভিত্তি মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (ধারা ৮)
কলামের বিষয় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ
ক্ষমতার ধরন শর্তহীন বা নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ (যেমন: নির্যাতন, খোরপোষ না দেওয়া)
কার্যকারিতা আদালত ছাড়াই ৯০ দিনের নোটিশে সরাসরি বিচ্ছেদ সম্ভব

কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম কেন নারীর জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

ডিরেক্ট আনসার (সরাসরি উত্তর): ১৮ নম্বর কলামটি নারীর আইনি সুরক্ষা ও আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রধান হাতিয়ার। যদি বৈবাহিক সম্পর্ক ক্ষতিকর বা নির্যাতনমূলক হয়ে পড়ে, তবে এই কলামে ক্ষমতা দেওয়া থাকলে নারী আদালত বা দীর্ঘ আইনি লড়াই ছাড়াই ‘তালাকে তাওফিজ’ প্রয়োগ করে ৯০ দিনের পারিবারিক নোটিশের মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন।

বাস্তব জীবনে একজন নারীর জন্য ১৮ নম্বর কলামের গুরুত্ব অপরিসীম। নিচে এর মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:

১. দীর্ঘমেয়াদী পারিবারিক আদালতের মামলা থেকে মুক্তি

যদি ১৮ নম্বর কলামে স্ত্রীকে অধিকার না দেওয়া হয়, তবে কোনো নারী যদি স্বামীর অন্যায় বা নির্যাতনের কারণে আলাদা হতে চান, তাকে ‘১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন’ (Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939)-এর অধীনে পারিবারিক আদালতে ‘ফাসখ’ (Judicial Divorce) মামলা করতে হয়। এই মামলা নিষ্পত্তিতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। কিন্তু ১৮ নম্বর কলামে অধিকার দেওয়া থাকলে কোনো আদালতের চক্কর ছাড়াই কাজী অফিস এবং ইউনিয়ন পরিষদ/সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে দ্রুত বিচ্ছেদ সম্পন্ন করা যায়।

২. দেনমোহর ও খোরপোষের অধিকার সুরক্ষিত রাখা

কনেপক্ষ যদি অধিকার না পেয়ে বিচ্ছেদ চায়, তবে অনেক সময় স্বামীকে রাজি করাতে 'খোলা তালাক' (Khula) করতে হয়, যেখানে স্ত্রীকে নিজের দেনমোহরের টাকা ছাড় দিতে হয় বা অর্থ বা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। কিন্তু ১৮ নম্বর কলামে 'তালাকে তাওফিজ'-এর ক্ষমতা দেওয়া থাকলে নারী নিজ নফসের ওপর তালাক গ্রহণ করলেও তার পাওনা দেনমোহর (Mahr) ও ইদ্দতকালীন খোরপোষ পুরোপুরি বহাল থাকে।

৩. বিবাহ বিচ্ছেদের বিভিন্ন পদ্ধতির তুলনামূলক চিত্র

বিচ্ছেদের ধরন আদালতের প্রয়োজন? দেনমোহর বাতিল হয়? সময়সীমা
তালাকে তাওফিজ (১৮ নং কলাম) না না (পাওনা বহাল থাকে) নোটিশের ৯০ দিন পর
খোলা তালাক (Khula) স্বামীর সম্মতি না থাকলে হ্যা সাধারণত ছেড়ে দিতে হয় সমঝোতার ওপর নির্ভর করে
জুডিশিয়াল ডিভোর্স (Faskh) হ্যাঁ (অবশ্যই) না ১ থেকে ৩ বছর বা তার বেশি

১৮ নম্বর কলাম ফাঁকা রাখা বা এতে ‘না’ লেখার আইনি ও সামাজিক ঝুঁকি কী?

ডিরেক্ট আনসার (সরাসরি উত্তর): কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম ফাঁকা রাখা বা এতে "না" লেখা স্ত্রীর আইনি অধিকারকে চরমভাবে সংকুচিত করে। এর ফলে চরম নির্যাতন বা অপব্যবহারের শিকার হলেও স্ত্রী নিজে তালাক দিতে পারেন না; তাকে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় অথবা দেনমোহর বিসর্জন দিয়ে স্বামীর করুণার ওপর নির্ভর করতে হয়।

আমাদের সমাজে ১৮ নম্বর কলাম নিয়ে দুটি প্রধান কুসংস্কার বা ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে:

  • ভুল ধারণা ১: "১৮ নম্বর কলামে 'হ্যাঁ' লিখলে বিয়ের দিনই স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেওয়া হয়।" — এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এতে কেবল স্ত্রীকে একটি আইনি অধিকার (Power of Attorney-এর মতো) অর্পণ করা হয়, যা কেবল প্রয়োজন হলেই প্রয়োগ করা যায়।
  • ভুল ধারণা ২: "মেয়েদের তালাকের অধিকার দিলে তারা সামান্য মনোমালিন্যেই সংসার ভেঙে দেবে।" — এটি একটি সামাজিক অন্ধবিশ্বাস। গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকার থাকা সত্ত্বেও নারীরা খুব চরম পরিস্থিতি ছাড়া এই ক্ষমতা ব্যবহার করেন না।

নিবন্ধন বা কাবিনের সময় কাজী বা বরপক্ষ যদি কনেকে না জানিয়ে এই ঘরে 'না' লিখে দেয়, তবে তা কনের সাথে এক ধরণের আইনি প্রতারণা। এর ফলে নারী বৈবাহিক সম্পর্কে বন্দি হয়ে পড়েন।


কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম সঠিকভাবে পূরণ করার নিয়ম কী?

ডিরেক্ট আনসার (সরাসরি উত্তর): কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম সঠিকভাবে পূরণ করতে বর ও কনে উভয়ের সম্মতিতে স্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা উচিত। "হ্যাঁ, স্বামী স্ত্রীকে ১ তালাকে বাযেন গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করিলেন" - এভাবে স্পষ্ট শর্ত বা শর্তহীন ক্ষমতা উল্লেখ করা সবচেয়ে নিরাপদ ও শরীয়তসম্মত পদ্ধতি।

কাজী অফিসে বিবাহের নিবন্ধনের সময় ১৮ নম্বর কলামটি পূরণে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত:

১. স্পষ্ট ভাষার ব্যবহার: অস্পষ্ট কোনো শর্ত না লিখে পরিষ্কারভাবে লিখতে হবে— "হ্যাঁ, স্বামী স্ত্রীকে নিজের নফসের ওপর ১ তালাকে বাযেন (Talaq-e-Bain) গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করিলেন।" ২. শর্ত যুক্ত করার সুবিধা: চাইলে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত যুক্ত করা যেতে পারে; যেমন—

  • স্বামী ভরণপোষণ না দিলে
  • শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করলে
  • স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করলে
  • দীর্ঘ সময় (যেমন: ২ বছর) নিখোঁজ বা কারাবন্দী থাকলে ৩. শর্তহীন বা আনকন্ডিশনাল পাওয়ার: সবচেয়ে উত্তম হয় যদি কোনো জটিল শর্ত ছাড়া সরাসরি ১ তালাকে বাযেনের ক্ষমতা দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে শর্ত প্রমাণের ঝামেলায় পড়তে না হয়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. ১৮ নম্বর কলামে 'হ্যাঁ' লিখলেই কি স্ত্রীর কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক চলে যায়?

উত্তর: না, ১৮ নম্বর কলামে 'হ্যাঁ' লিখলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয়ে যায় না। এটি কেবল স্ত্রীকে একটি আইনি অধিকার প্রদান করে। স্ত্রী নিজে যদি পরবর্তীতে কোনো কারণে এই ক্ষমতা প্রয়োগ (Exercise) না করেন, তবে তালাক পতিত হবে না।

২. তালাকে তাওফিজের মাধ্যমে তালাক দিলে কি নারী দেনমোহর পান?

উত্তর: হ্যাঁ, তালাকে তাওফিজের মাধ্যমে স্ত্রী নিজের ওপর তালাক গ্রহণ করলেও তিনি তার পুরো দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন খোরপোষ আইনগতভাবে পাওয়ার যোগ্য থাকেন।

৩. ১৮ নম্বর কলামে অধিকার না থাকলে একজন নারী কীভাবে তালাক দিতে পারেন?

উত্তর: ১৮ নম্বর কলামে অধিকার না থাকলে নারী সরাসরি তালাক দিতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে তাকে স্বামীর সাথে আপস করে 'খোলা তালাক' করতে হয় অথবা পারিবারিক আদালতে 'ফাসখ' (Judicial Divorce) মামলা দায়ের করতে হয়।

৪. তালাক কার্যকর হতে কতদিন সময় লাগে এবং পদ্ধতি কী?

উত্তর: তালাকে তাওফিজ প্রয়োগ করার পর লিখিত নোটিশ চেয়ারম্যান/মেয়র এবং স্বামীকে পাঠাতে হয়। নোটিশ প্রাপ্তির দিন থেকে ৯০ দিন (বা গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত) অতিক্রম করার পর তালাক আইনগতভাবে চূড়ান্ত বা কার্যকর হয়।


উপসংহার ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম কেবল একটি কালির দাগ বা আইনি বাধ্যবাধকতা নয়; এটি একটি মেয়ের বৈবাহিক জীবনের নিরাপত্তা বলয়। এটি স্বামীকে তালাকের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না, বরং দাম্পত্য সম্পর্কে ক্ষমতার ভারসাম্য এনে দেয়। বিয়ের সুসংবাদ ও আনন্দের মাঝে এই আইনি বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে বর ও কনে—উভয়পক্ষের উচিত সচেতনভাবে ১৮ নম্বর কলামটি সঠিকভাবে পূরণ করা।

আপনি যদি বিয়ে করতে যাচ্ছেন বা পারিবারিক আইন সংক্রান্ত কোনো জটিলতায় আছেন, তবে অভিজ্ঞ পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞ বা নিবন্ধিত কাজীর সাথে পরামর্শ করে নিজের অধিকার সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন।

Kobul.com App Screenshot

আপনার বিবাহের পথ সহজ করুন

Kobul.com শুধু একটি ম্যাট্রিমনি সাইট নয়, এটি একটি বিশ্বস্ত কমিউনিটি যেখানে আপনি মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে আপনার জীবনসঙ্গী খুঁজে নিতে পারেন।

  • ভেরিফাইড প্রোফাইল: প্রতিটি প্রোফাইল আমাদের টিম দ্বারা সতর্কতার সাথে যাচাই করা হয়।
  • সম্পূর্ণ গোপনীয়তা: আপনার ব্যক্তিগত তথ্য এবং যোগাযোগ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে।
  • পারিবারিক অংশগ্রহণ: পরিবারের সম্মতিতে এবং তাদের যুক্ত রেখে সঙ্গী নির্বাচন করার সুযোগ।
Get it on Google Play